Friday, June 27, 2014

আমরা সবাই রাজা

বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবনে আসার পর খাবারের রুটিন পাল্টে গিয়েছিলো অকল্পনীয় রকমে। সকালে নাস্তা করা হতো না দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। ফলাফল গ্যাস্ট্রিকের গেঞ্জাম আর কারণ ছিল প্রয়োজন অথবা অপ্রয়োজনে রাত জাগা। প্রয়োজন এর প্রধান কারণ ছিল পড়ালেখা, আর অপ্রয়োজনের কারণ একাধিক- আড্ডা দেয়া, রাত করে শহিদুল্লার পুকুর পাড়ে আর কার্জনে ঘুরা, সিনেমা অথবা টিভি সিরিজ দেখা। ভালো খারাপ যেই কাজই করি না কেন ঘুমাতাম ফজরের পর। সারা রাত জেগে থাকার কারণে মাঝরাতে একবার খাওয়া লাগতো। এই খাওয়ার টাইমটা ছিল অদ্ভুদ। রাত দুইটা থেকে তিনটার দিকে। কপাল ভালো ছিল যে আমাদের একুশে হলের সামনে সারা রাত দুইটা দোকান খোলা থাকতো। ভাত পাওয়া না গেলেও পরোটা সব সময় পাওয়া যেতো। রাত জাগার সাথে সাথে রাত করে খেতে যাওয়াটাও পরিণত হল অভ্যাসে। 

হলের সামনের ওই দোকানে কাজ করতো একটা পিচ্চি ছেলে। প্রায় রাতেই খেতে গেলে ও পরোটা আর ডাল ভাজি আগায় দিতে আসতো। হোটেলের অন্য কর্মচারীরা মাসের ১৫ দিন দিনে আর বাকি ১৫ দিন রাতে ডিউটি করতো। কিন্তু, ওই ছেলেটা পাক্কা ৩০ টা দিনই রাতে ডিউটি করতো। একদিন ভাবলাম যে এই কারণটা নিয়ে ওকেই জিজ্ঞেস করবো। ওই রাতে ওর সাথে আমার কথোপকথন ছিল এমনঃ

আমিঃ এই ভাইয়া, শোন?
পিচ্চিঃ কি ডাইল লাগব আরও?
আমিঃ নাহ। তোমার নাম কি?    
পিচ্চিঃ রাজা। 
আমিঃ তুমি কি সবসময় রাতে ডিউটি করো?
রাজাঃ হ।
আমিঃ সারা রাত ডিউটি করলে কত দেয়? 
রাজাঃ হুদা রাইতের লইগা ৫০ ট্যাকা।
আমিঃ বয়স কত?
রাজাঃ কেউ কয় ৮ বছর, কেউ কয় ১০ বছর। 
আমিঃ রাতে ঘুমাও না কেন তুমি? এক সময় গিয়ে সরির খারাপ করবে।
রাজাঃ রাইতে ঘুমাইলে স্বপন দেহি। ভয় লাগে। তাই ডিউটি করি।  
আমিঃ কি স্বপ্ন দেখো?
রাজাঃ আমার আব্বায় আমি অনেক ছোট থাকতেই অনগরে ফালায় দিয়া চইলা গেছে। আমি আম্মার লগে থাকতাম। আম্মায় অসুখে মইরা যাওনের পর নানী ঢাকাত পাডায় দিসে। ঢাকাত আসার পর রাইতে ঘুমাইলেই আম্মারে স্বপ্নে দেহি। হেয় আমারে ডাকে হের কাছে যাইতে। খুব ডর লাগে।

কথপোকথন আর বেশি দূর আগায় নি ওই রাতে। ওই ছেলেকে সাহায্য করা বলতে আমি আর আমার বন্ধুরা হয়তো ৫ টাকা ১০ টাকা টিপস দিতাম। মাঝে মাঝে কাছে ডেকে কথা বলতাম। এর বেশি কিছু না। কারণ এর চেয়ে বেশি কিছু করার সাধ্য কিংবা ক্ষমতা আমাদের কারোই ছিল না। আমরা না কেউ পারবো তার মাকে তার কাছে ফিরিয়ে আনতে, না পারবো তাকে তার মার কাছে পৌঁছে দিতে, না পারবো স্বপ্নে তার মাকে তাড়িয়ে দিতে, না পারবো এই রাজাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে।

 


No comments:

Post a Comment