Tuesday, October 31, 2017

আলু বই পড়ে

ব্যাচেলর জীবনে যেই কাজগুলো খুব শান্তি করে করতে পারতাম, সেই সকল কাজ এখন করা খুব মুশকিল। যেমনঃ বই পড়া, টিভি সিরিজ দেখা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া। বিয়ের পর জীবন পাল্টে গেছে। তবে একটা নতুন ডিমেনশন এসেছে। আমি আর আলু’র আম্মু অনেক ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু, আলু পরিবারে চলে আসার পর থেকেই সকল সমীকরণ বাসার মাঝে আটকে গেছে।

রাতে যখনই ভাবি আলু ঘুমিয়ে গেছে, তখন আমি বইটা হাতে নেই। কিছুক্ষণ পর দেখি, আলু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। এর পর আস্তে আস্তে আমার দিকে আসে। এসে দেখে আমি কি করতেছি। তারপর আমার উপর উঠে বসে আর বলেঃ “পাপা, পল।” এরপর আমি কিছুক্ষণ পড়ি, সে শুনে, তার ভালো লাগে না। সে টান মেরে বইটা হাতে নেয়, নিয়ে ঐ পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে ফেলে। আমি কিছু বলার আগেই সে বলেঃ “আলু ভালো লাগে না। নেক্সট, পাপা।” আবার পড়া শুরু করি, আবার সেই একই কাহিনী। এরপর থেকে কোন হার্ড কপি আর বাসায় পড়ি না। ল্যাবে যাওয়ার এবং আসার পথে পড়ি। আর কিন্ডল হাতে পেলে তো সমানে ডানে বামে যেতে থাকে। মাঝে মাঝে উল্টা করে ধরেই এই কাজ চালায়। দূর থেকে যে কেউ দেখলে ভাববে যে, পড়ে শেষ করে ফেলতেছে সব।

এবার আসা যাক টিভি সিরিজ দেখায়। যদি কোন পর্বে মারামারি থাকে, তাহলে বলবেঃ “মামুনি, ও মারে।” ওর আম্মু বলবেঃ “তোমাকে তো মারে নাই। তুমি চুপ করে দেখো।” সে থামবে না, বলবেঃ “আলু খারাপ লাগে।” আবার যদি কুল টাইপের পর্ব চলে, যেখানে শুধুই আলাপচারিতা, তাহলে বলবেঃ “মামুনি, ওরা খালি কতা বলে। পাপা ও খালি কতা বলে।” ব্যাপারটা এমন না যে, সে এই সব না দেখে কার্টুন দেখবে। সে খুব একটা কার্টুন দেখে না। কিন্তু, সে সব ব্যাপারে কমেন্ট করবে। শুধু মাত্র একটা জিনিসই সে খুব এঞ্জয় করেঃ বিজ্ঞাপন। খেলা দেখার সময় আমরা সে ঘাপটি মেরে সোফার এক কোনায় বসে থাকে। যখনই বিজ্ঞাপন আসে, সে লাফ মেরে সোফা থেকে উঠে টিভির সামনে চলে যায়, আর তার পারফর্মেন্স শুরু হয়ে যায়।

বাসায় মেহমান আসা নিয়ে ধরা যাক। বাসায় আসা প্রতিটা মেহমানকে সে শত্রু হিসেবে দেখে। কেউ বাসায় ঢুকলেই সে সাথে সাথে ভিতরের রুম থেকে সামনের রুমে চলে আসে। এসে তার চার পাশ দিয়ে হাটে আর দেখে। কোন কথা বলে না। ওরে অন্যরা কাছে ডাকলেও যায় না। কারণ সে কমেন্ট করার জন্য ক্লু খুজতেছে। ঐ দিন এক মেহমান আসলো, তাকে খেতে দেয়া হল, আলুকে অনেক বলার পর ও সে কিছু খায় না। যখনই তার ঐ আঙ্কেল নাগেটস খাওয়া শুরু করল, সে আমাকে বলতেছেঃ “পাপা, ও নাগেটস খেয়ে ফেলতেছে। আলু কি খাবে?” ওরে থামানোর জন্য বললামঃ “মা, বাসায় আরও নাগেটস আছে। তুমি খেতে পারবা পরে।” সে কি আর আমার কথা শুনে। সে অভিযোগ করেই যাচ্ছেঃ “নাগেটস খেয়ে ফেলে। নাগেটস নাই। আলু নাগেটস নাই। আলু ভালো লাগে না।” এই রকম ভাবেই মেহমানদেরকে সে বিব্রত করে সব সময়।


কথা হল, বই পড়ার সময় হয় না, টিভি সিরিজ দেখার সুযোগ হয় না, কারো সাথে আড্ডা দেয়া সম্ভব হয় না, তারপর ও জীবন একটা গতিতে চলছে। কারণ, আলু আমার দেখা সবচেয়ে রহস্যময় বই। আমি ওরে প্রতিদিন পড়ি। তারপর ও ঠিক বুঝতে পারি না। তাই বার বার পড়ি। সে নিজেই একটা লাইভ টিভি। তার কাণ্ডকারখানা প্রফেশনাল অভিনেতাদের হার মানায়। আর আড্ডা দেয়ার জন্য তো সে সারা দিন ফ্রি।  

No comments:

Post a Comment